বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে যশোরে মানববন্ধন, গণসমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে শহরের দড়াটানা ভৈরব চত্বরে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলা ইউনিট কমান্ডের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক মো. আব্দুল লতিফ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের প্রতি চরম অবমাননা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষায় এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তাঁরা।
সভাপতির বক্তব্যে মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ১৯৭১ সালে পরাজিত শক্তি আজও বাংলাদেশের মাটিতে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। একজন মুসলমান কীভাবে আরেকজন মুসলমানের জানাজা ও দাফনে বাধা দিতে পারে, তা বোধগম্য নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে গড়া এই দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে।
বক্তারা আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে বাধা দেওয়ার ঘটনা পুরো জাতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনি কার্যক্রমে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে কারও মরদেহ দাফনে বাধা সৃষ্টি করা হয়ে থাকলে তা নাগরিক অধিকার ও বিচারব্যবস্থার জন্য গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার এএইচএম মুযহারুল ইসলাম মন্টু, সদর উপজেলা কমান্ডের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম উদ দ্দৌলা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ, জাসদ নেতা রবিউল আলম, বাসদ নেতা হাচিনুর রহমান এবং প্রেসক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলামসহ অন্যরা।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন গোলাম রসুল ও অলিয়ার রহমান। সমাবেশ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শহরের দড়াটানা হয়ে বকুলতলা মোড় প্রদক্ষিণ করে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।
এদিকে একই ঘটনার প্রতিবাদে সাতক্ষীরার পাকাপোল এলাকায়ও মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাতক্ষীরা জেলা ইউনিটের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা সঞ্চালনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তফা নুরুল আলম।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী বলেন, ১৯৭১ সালে পরাজিত শক্তি আজও নতুন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ। এ দেশ রাজাকারদের নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের ফলেই আজ জাতি স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। অথচ একজন সদ্যপ্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে একজন মৃত মানুষের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি, বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হোসেন, আব্দুর রউফ, আব্দুল হামিদ, আব্দুস সোবহান, শফিক আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, গণফোরাম নেতা আলিনুর খান বাবুল, জাসদ নেতা হেলালুর রহমান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহি, সিপিপি নেতা আবুল হোসেন এবং ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা স্বপন কুমার শীলসহ অন্যরা।
মতামত