কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত মণিরামপুরের একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ ১১ দিন পর নিজ গ্রামে পৌঁছেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শেষবারের মতো তাঁদের দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী। পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে চারটি কবর।
নিহতরা হলেন মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাঁদের দুই শিশুকন্যা রুজাইনা ইনায়া ও সুনাইনা ইহানা।গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের ইনানী সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় প্রথমে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ছেলের সঙ্গে শেষ ফোনালাপের স্মৃতিচারণা করে বাবা মতিয়ার রহমান বলেছিলেন, ‘শুক্রবার রাতেও নাহিদের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। কল করে বলছিল, সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে।’ বুধবার ঢাকায় ফিরে আসার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন ছেলে। কিন্তু পরদিন সকালের অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু বদলে যায়।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছিলেন নাহিদুর রহমান। রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন তিনি। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন মিরপুরে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত টুপটুপ রিসোর্টে থাকার জন্য বুকিং দিয়েছিলেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের খোঁজ শুরু করেন। উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর মধ্যে দুটি শিশুর মরদেহ থাকলেও সেগুলো তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কি না, তা তখন নিশ্চিত হওয়া যায়নি।পরে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পরীক্ষার মাধ্যমে নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের পরিচয় শনাক্ত করে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সে করে চারজনের মরদেহ বুধবার সকালে মোহনপুর গ্রামে নিয়ে আসা হয়।
একসঙ্গে ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। যে বাড়িতে একসময় দুই শিশুর হাসি-আনন্দ ছিল, সেখানে এখন চলছে চারজনকে শেষবিদায় জানানোর প্রস্তুতি।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চারজনের জানাজার জন্য স্থানীয় মসজিদ থেকে চারটি খাটিয়া আনা হয়েছে। পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। বুধবার বিকেল ৩টায় স্থানীয় বাঁধাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে তাঁদের দাফনের কথা রয়েছে।
সৈকতে বেড়াতে গিয়ে আর জীবিত ফেরা হলো না নাহিদুর রহমানের পরিবারের। শুক্রবার রাতের সেই শেষ ফোনালাপ—‘সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে’—এখন বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমানের কাছে সন্তান ও নাতনিদের শেষ স্মৃতি।